Monday, February 3, 2025

পশু বসুন্ধরা, ০৩/০২/২০২৫ :  প্রকৃতির ওপর মানুষের আক্রোশ যেন প্রতিদিন বেড়েই চলেছে।  মানুষ রীতিমত লাগাম ছাড়া হয়ে উঠেছে এবং প্রায় দিনই প্রাকৃতিরমানবিক আচরণ করে মানুষ নিজেকে প্রকৃতির শত্রু করে তুলছে। ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। বাতাসে বিষ ছড়াচ্ছে। শীতকাল বেশিদিন স্থায়ী হচ্ছে না. জীবন ধারণ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। প্রকৃতি খামখেয়ালির মত  আচরণ করছে। প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছে মানুষের। 

উত্তরবঙ্গের কিছু সংখ্যক মানুষ প্রকৃতির সাথে অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করে চলেছে। সব মানুষ নয়, কিছু মানুষ, তবে বেশিরভাগ মানুষই এই ধরনের  আচরণ করে চলেছে যার জেরে প্রকৃতি রুষ্ট হয়ে উঠছে। উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র হল শিলিগুড়ি শহর. এই শহরের উন্নয়ন হয়েই চলেছে। এই শহরে মানুষের ভীড় বাড়ছে প্রতিদিন। নতুন নতুন রাস্তা তৈরি হচ্ছে। ফ্লাই ওভার তৈরি হচ্ছে। নতুন বহুতল উঠছে। গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে।  আর গাড়ির সংখ্যা যতই বাড়ছে এই শহরে দুর্ঘটনায় ততই বাড়ছে, আর সেই দুর্ঘটনায়  মানুষের পাশাপাশি মারা পড়ছে প্রচুর সংখ্যক পশুও।

শিলিগুড়ি শহরের অদূরেই রয়েছে মাটিগাড়া। এখানে রাস্তাঘাটে এখনও  যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায় গরু, মোষ, ষাঁড় ওই বাছুরের দোল. প্রায় এদেরকে হাই ওয়ের ওপর মোর পরে থাকতে দেখা যায়. যেখানে সেখানে পড়ে  থাকে পথ কুকুরের মৃতদেহ। মৃতদের  তালিকায় প্রায় থাকে চিতা , হাতি ও অন্যান্য পশুদের নামও।  শিলিগুড়ি শহরের দুই দিক থেকে দুই মহা অরণ্য, একটি হল মহানন্দা স্যাংচুয়ারি যা কিনা শুকনা ফরেস্ট, গুল্ম ফরেস্ট নামেও পরিচিত শহরের উত্তর দিকে। আবার নেপাল সীমান্তের দিকেও রয়েছে অরণ্য। শহরের আর এক দিকে রয়েছে বৈকুণ্ঠপুর অরণ্য।  সুতরাং এই অরণ্যগুলি থেকে প্রায়ই পশুরা বেরিয়ে আসে এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়. কিছুদিন আগেই ঘোষপুকুরের কাছে একটি বাঘ সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ে  প্রাণ হারিয়েছে।

উত্তরবঙ্গের কিছু সংখ্যক মানুষের যেন প্রকৃতির সাথে সংঘাত একটু বেশিই। তাঁদের বক্তব্য অরণ্য থাকুক না থাকুক তাঁদের নিশ্চিন্ত বসবাস যেন থাকে। বোনের সম্পদ যেন তাঁদের জন্মগত সম্পদ। এবং সেগুলি তাঁদের অকাতরে ব্যবহার করার অধিকার রিয়েছে একতরফা। সেই সম্পদ আহরণ করে তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে যাবে বছরের পর বছর.  তারা গাছ কেটে নিয়ে যাবে, বোন ধ্বংস করবে, পশু চোরাকারবারিদের সাহায্য করবে কিন্তু তাতে  তাদেরকে কিছু বলা যাবে না. অতচ তাদের রক্ষা করতে সরকার সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পশুদের দ্বারা তাদের  কোনোরূপ ক্ষতি হলে সরকার তার ক্ষতি পূরণ করবে। অথচ সরকারের কোনো নিয়ম তারা মানবে না. 

ডুয়ার্স এলাকায় কোনো জায়গায় হাতি বের হলে  পিল পিল করে এই ধরনের মানুষ সেই হাতিদেরকে ঘিরে ধরে তাড়া  দে. ইঁট  ছোঁড়ে, পাঠে ছোঁড়ে। হল্লা করে. এমন একটা ভাব করে যেন তারা কখনো হাতি দেখে নি. জঙ্গলে প্রচন্ড খাদ্যাভাব থাকায় প্রায় পশুরা বাইরে বের হয়ে আসছে। তারা অরণ্যের প্রান্তে থাকা গ্রামগুলিতে হানা দিয়ে খাদ্য জোগাড় করে নিয়ে যায়. এই পশুদের দূর থেকে দেখতে যাওয়ার অছিলায় কিছু মানুষ তাদের বিরক্ত করে , ঢিল ছোঁড়ে। হল্লা করে পশুদের ভয় দেখায়। এই পশুগুলো যে সবসময় ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে তা নয়. 

ডুয়ার্স বা পাহাড় অঞ্চলে প্রায়ই দেখা যায় ঝাঁকে ঝাঁকে বানরের দোল জঙ্গল ছেড়ে বাইরে রাস্তার ধরে এসে ভীড় করে কার্যত ভিক্ষা করছে একটুকু খাবারের জন্যে।  জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা ভাগ বিড়ালকে মেরে দেওয়া হচ্ছে। সাপ মেরে দেওয়া হচ্ছে। ভালুককেও মেরে দেওয়া হচ্ছে। সুন্দর দেখতে পাখি এবং ময়ূর হলে তো আর রক্ষে নেই. দুদিন আগেই দমদম এলাকায় একটি ডেন্টাল হাতি মেচি নদীর ছোড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।  খাবারের সন্ধানে সে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল, বোন দপ্তর দুদিন ধরে তাকে ফের অরণ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার চেস্ট চালাচ্ছিল. এর মধ্যেই বিশাল জনতা হাতিটিকে ঘিরে ধরে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করে. হাতিটি ক্ষেপে গিয়ে একটি ওয়াচ টাওয়ারে আক্রমণ চালায়। ঐ  ওয়াচ টাওয়ারের মাথায় তখন পর্যাতকেরাও ছিল. এর পরেই একটি জেসিবি মেশিন নিয়ে হাতিটিকে আক্রমণ করা হয়. জেসিবির সাথে তুমুল সংঘাত হয় ওই  হাতিটির। জেসিবি সামনের লোহার দাঁতগুলো ভেঙে হাতির মাথায় বসে যায়. হাতির নিজের দাঁতগুলিও মাথার মধ্যে ঢুকে যায়. ঐ  অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়া হয়. ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই হাতিটি মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে।  পরে ঐ  জেসিবি চালককে আটক করে পুলিশ। 

একই রকম ঘটনা কিছুদিন আগেই ঘটেছিল ঝাড়গ্রামে এক অন্তঃসত্ত্বা হাতির কপালে। ডুয়ার্সে নেপুচপুর চা বাগানে একটি খাঁচায় একটা চিতাবাঘ ধরা পড়ে।  এখানেও ভীড় করে মানুষ তাকে দেখতে আসে শুরু হয় সেলফি  তোলার হিড়িক। তিক্তক, রিলিস ইত্যাদি। এমন সময় খেয়াল করা যায় চিতার লেজটি একটি যেন বেরিয়ে আছে. ব্যাস, সঙ্গে সং চিতার লেজ ধরে টানামানি শুরু হয়ে যায়. চিতাবাঘটি খাঁচার মধ্যে যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকে।  এই ঘটনাগুলো তও খবর হয়, এমন কত যে ঘটনা ঘটে যা কিনা খবর হয় না, তার কোনো হিসেব নেই.  

এই ধরনের ঘটনা যতই ঘটতে থাকবে ততই প্রকৃতির ওপর অত্যাচার বেড়েই চলবে। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যতই গাছ কাটা হবে ততই রুষ্ট হয়ে উঠবে প্রকৃতি, গরম বাড়বে হাওয়ায়। বাতাসে মিশবে বিষ. প্রতি বছর নানান নামে ফিরে  আসবে বিষাক্ত ভাইরাস, লাগবে মোড়ক। আর তাতে মারা পর্বে মানুষই।  উন্নয়নের চোখ ধনাঢ্য আলোয় মানুষ এখন বুঝেও হয়ত বুঝছে না, কিন্তু যখন বুঝবে তখন বোধ হয় অনেকটা দেরি হয়ে যাবে। 

No comments:

Post a Comment